রূপান্তর

সুলেখা আক্তার শান্তা

  বিশেষ প্রতিনিধি    30-10-2022    119
রূপান্তর

ফুলভানুর সারাদিন কাটে চুলার পাড়ে। চুলার গনগনে আগুনের তেজ বাড়ার সাথে সাথে তার কাজের গতিও বাড়তে থাকে। ভোরে সূর্য ওঠার আগে কাজ শুরু শেষ হয় রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে। মাঝে গোসল, খাওয়া দাওয়ার জন্য একটু সময় বের করে নেয়। মুড়ি ভাজার উপার্জনে চলে তাঁর জীবন জীবিকা। বিরামহীন ভাবে মুড়ি ভাজার কাজ করতে হয়। ফুলভানুর চেহারায় ফুলের কোনকিছু আজ আর অবশিষ্ট নাই। চুলার পাড়ে থাকতে থাকতে ফুলভানুর গায়ের রং পাতিলে কালির মতো কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। আর মুখমন্ডল ধারণ করেছে আরো শোচনীয় অবস্থা। লোকজন এখন ফুলভানুকে কালাভানু বলে ডাকে। তাতে ফুলভানু কখনো বেজার হয় না বরং হাসিমুখে সবার ডাকে সাড়া দেয়। প্রচন্ড খাটাখাটনি পরেও মুখে তাঁর হাসি সব সময় লেগেই থাকে। জাহানারা বলেন ফুলভানুকে, তোমার মনে বড় আনন্দ। দেইখা মনে হয় না তোমার কোন দুঃখ কষ্ট আছে।

ফুলভানু বলেন, কপালে যা লেখন আছে তা কে খন্ডাবে। ভাগ্য মেনে নিয়ে জীবন চালালে দুঃখ কম হয়। ফুলভানুর সঙ্গে প্রতিবেশী জাহানারা সম্পর্ক ভালো। ফুলভানু বালিয়া গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে। ছেলেকে নিয়েই তার যত আশা—ভরসা। জাহানারা দেখেছে টিকে থাকতে কত দুর্দশা পোহাতে হয়েছে ফুলভানুকে।

ফুলভানু যেমনই হোক কিন্তু তাঁর মধ্যে তেজ অনেক। তাঁর ঠিকানা পরিচয় নিয়ে অনেকে কথা বলে। সে কথা শুনে ফুলভানু জ্বলে উঠে। জাহানারা ফুলভানুর বিষয় জানতে চাইলে, ফুলভানু বলেন জাহানারাকে, আমি চোর না ডাকাত! এত জানার কি আছে? আমি কি কারো মাথায় বাড়ি দেয়েছি। নাকি কারো কোন কিছু আত্মসাৎ করছি। আমাকে চেনো আমার কর্ম দিয়ে। এর বাইরে আর কিছু জানতে চেওনা।

ফুলভানু তুমি রাগ করো কেনো? তুমি অনেক ভালো মানুষ অনেকের অর্থ—সম্পদ থাকতেও তারা কাউকে কিছু দেয় না। আর তোমার যেটুকু আছে তাই দিয়া তুমি মানুষের জন্য কিছু করো। তোমার ভালো মানসিকতা বড় ভাবায়।

কিবা করি, আমার যদি থাকতো তেমন তা মানুষের জন্য করতাম। দু’জনের কথার আলাপের মধ্যে একজন ডাক পিয়ন এসে ফুলভানুর খোঁজ করে। ফুলভানুর কাছে একটি চিঠি এসেছে। ফুলভানু ও জাহানারা দু’জনই অবাক।

জাহানারা ভাবে ফুলভানুর তো এক পঙ্গু ছেলে ছাড়া আর কাউকে দেখি নাই। হঠাৎ কে তাঁকে চিঠি দিলো। জাহানারা বলেন, কি আছে চিঠিতে পড়ে শুনাও না। ফুলভানু বলেন, এই চিঠি আমার বাবার মৃত্যু আগের লেখা। বাবা আমার খোঁজ পেয়েছিল আমি এখানে আছি। বাবার মৃত্যুর পর আজম চাচা চিঠিটি প্রেরণ করেছে। চিঠিতে বাবা জানিয়েছেন তিনি তার সম্পত্তি আমার নামে উইল করে গেছেন। জাহানারা বড় চোখ করে ফুলভানুর দিকে তাকায়। হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করে, কে গো তুমি ফুলভানু?

আমি এক বড়লোক পিতার সন্তান। অর্থ—সম্পদ কোন দিকে কমতি নাই আমার বাবার। কিন্তু সেই অর্থ—সম্পদের আড়ালে আছে লোমহর্ষক এক কাহিনী। ফুলভানু সব কথা খুলে বলে জাহানার কাছে। আমার নাম ফুলভানু নয়। আমি রিয়া। বাবা ফয়সাল আহমেদ দাম্ভিকতার কাছে কেউ কথা বলার ছিল না। জুলুম অত্যাচার দিয়ে মানুষের অর্থ—সম্পদ আত্মসাৎ করাই ছিল তার কাজ। তাই করে, আমার বাবা সম্পদের পাহাড় গড়েছে। অবস্থাপন্ন পিতার মেয়েদের কলে কৌশলে বিয়ে করত। বিয়ের পর চালানো হতো পরিকল্পিত নির্যাতন। সহায়—সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া শেষ হলে তাদের ছুড়ে ফেলতো। বাবার এমন অমানুষিক আচারণ দেখে মা ফারজানা নিরবে কাঁদতো। বাবার কীর্তিকলাপের প্রতিবাদ করা হলে বাবা মাকে ধরে মারত। বাবার যন্ত্রণায় মা ধুকে ধুকে মারা যায়। আমি ছিলাম বাবার একমাত্র সন্তান। বাবাকে বাবা বলে ডাকতেও ভয় পেতাম। বাবার চেহারা সবসময় ভয়ানক রূপ ধারণ করে থাকতো। নিজ চোখে দেখতাম বাবার খারাপ কাজগুলো। পুরো বাড়ি মানুষ তার একটি কথার আওয়াজে শব্দ স্তব্ধ হয়ে থাকতো। বাবার সম্মুখীন হওয়া সাহস কারো ছিলনা। বাবা আমাকে তার নিজের পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। আমার স্বামী শিপনের অর্থ—সম্পদ দেখে বাবা আমাকে বিয়ে দেন। বাবা শিপনের সম্পদের দিকে দৃষ্টি দিলে তাতে আমি বাধা হয়ে দাঁড়াই। একপর্যায়ে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। জামাইকে মেরে ফেলে হলেও তার সম্পত্তি কব্জা করবে। শিপনকে বাবার মৃত্যুদন্ড হাতে থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি। আমার ছেলে রাছেলের বয়স তখন এগার। ও ছিল সুস্থ স্বাভাবিক। নিজ চোখের সামনে ওর পিতাকে মেরে ফেলার দৃশ্য দেখে। নিদারুণ কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলার ভয়ংকর দৃশ্য দেখে এক আর্তচিৎকার দেয়। ওই চিৎকারটা ছিল ওর কন্ঠের শেষ শব্দ। তারপর চিরদিনের জন্য রাছেলের জবান বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন খুনের দৃশ্যটি দেখে ফেলায় ফয়সাল আহমেদ দা নিয়ে ধাওয়া করে নাতি রাসেলকে। রাছেল দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। ফয়সাল আহমেদ দা ছুড়ে মারে রাছেলের দিকে। তাতে রাছেলের পা মারাত্মকভাবে কেটে যায়। তখন থেকে ছেলে আমার জনমের মত জবান আর চলাফেরায় পঙ্গু। ফয়সাল আহমেদ ক্ষমতা আর অর্থ লোভে কারো প্রতি মায়া—মমতা কিছু ছিল না। লোভে তাকে অমানুষ পিশাচে পরিণত করেছিল। সেই থেকে আমি নিজের ছেলেকে নিয়ে আত্মগোপনে আছি আমার ভেষ পোষাক পালটিয়ে। অর্থ—সম্পদ টাকা পয়সা পৃথিবীর জন্য কিছুই না। যে বাবার এত অর্থ—সম্পদ আজ সে কোথায়। তার সবকিছুই তো পড়ে আছে। এত টাকা—পয়সা ক্ষমতা ছিল তার কিন্তু নিজের স্ত্রী সন্তানের জীবন ছিল বিভীষিকাময়। তাকে কেউ ভালোবাসতো না ভয় করতো। মানুষের অভিশাপ নিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

রিয়ার বাবা তার সব সম্পদ মেয়ের নামে উইল করে গেছে। অন্তিম মুহূর্তে মানুষের জীবনে আসে সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি। রিয়া সমস্ত সম্পত্তি গরিব—দুঃখীর মাঝে বিলি করে দেয়। স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ছাড়ে সে। বলেন, আজ আমি মুক্ত হলাম সব দাম্ভিকতা থেকে। বাবা তুমি অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ কর সুখী হতে চেয়েছিল। তুমি সুখী হতে পারোনি, তোমার চারপাশে কাউকেই সুখী করতে পারোনি।

জাহানারা বলেন, ফুলভানু কিছু সম্পদ তো তোমার নামে রাখতে পারতে। একটা সন্তান আছে তোমার। কোন বিবেকবান মানুষ পারেনা অন্যের সম্পদ ভোগ করতে। মানুষ যদি তার চারপাশে জুলুম—অত্যাচারের প্রতিবাদ করে তাহলে যারা অসৎ কাজে লিপ্ত তারা এগুলো করতে পারেনা। খারাপের সংখ্যা কম। ভালোর সংখ্যা বেশি। সেই ভালো মানুষগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে ভালো কাজে। না হলে খারাপ কর্তৃত্ব করবে ভালোর উপর। ফুলভানু আজ তোমাকে দেখে বুঝলাম মানুষ নিজেকে ভালো রাখতে চাইলে তার চারপাশে খারাপ থাকলেও সে নিজেকে ভালো রাখতে পারে। সবকিছু হচ্ছে নিজের সদিচ্ছা। তোমার প্রচেষ্টা জয়ী হোক।

ফুলভানু পল্লীর অখ্যাত এক গ্রামে সংগ্রামী জীবনে শান্তি খুঁজে পায়। মুড়ি ভাজার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। সংকটে থাকলেও নিজের কষ্টের রুজি পরিতৃপ্ত করে তাঁকে। ফুলভানু স্বল্প রোজগার থেকে কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে অবশিষ্ট দিয়ে অন্যের সংকটে শামিল হয়। স্থির করে দুঃখ কষ্ট নিয়ে জীবনের বাকি পথ পাড়ি দেবে তাতে মানুষের অমানুষ হয়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হবে।

1