সাতক্ষীরার ছয় আনি জমিদার বাড়ির গেট: সময়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠা এক প্রাচীন প্রতিধ্বনি

  প্রতিবেদক: শেখ সিদ্দিকুর রহমান    14-10-2025    262
সাতক্ষীরার ছয় আনি জমিদার বাড়ির গেট: সময়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠা এক প্রাচীন প্রতিধ্বনি

সাতক্ষীরার মাটি যতটা উর্বর, ততটাই সমৃদ্ধ তার ইতিহাস। সেই ইতিহাসের বুক চিরে, সময়ের ক্ষয়রেখায় আজও দাঁড়িয়ে আছে সাতক্ষীরার ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ প্রহরী— ছয়আনি জমিদার বাড়ির গেট।

লাল ইটের গায়ে শুকিয়ে গেছে সময়ের ঘাম, গাছের শেকড় গেঁথে বসেছে স্থাপনার বুকে; তবু এই ভগ্ন প্রাচীর আজও যেন নীরবে বলে ওঠে— “আমি দেখেছি সাতক্ষীরার জাগরণ।”

আধুনিক সাতক্ষীরার প্রাণপুরুষ প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর শিকড় নিহিত এক প্রাচীন অধ্যায়ে। তাঁর পিতা বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নিকট থেকে বুড়ন পরগণা নিলামে ক্রয় করে সাতক্ষীরার প্রাচীন অরণ্যে বসতি গড়েছিলেন। যে ভূমিতে তখন ছিল কাঁটা, বাঘ, শিয়াল আর ঘন জঙ্গল—সেই অরণ্য কেটে তিনিই আনেন সভ্যতার আলো।

বিষ্ণুরামের দুই পুত্র—রাধানাথ ও প্রাণনাথ—ছিলেন দুই মেরুর মানুষ। রাধানাথ ছিলেন শান্ত ও বিনয়ী, আর কনিষ্ঠ প্রাণনাথ ছিলেন অদম্য সাহসী, মানবসেবায় অনন্য ও প্রখর মেধাবী। জীবনের শেষ অধ্যায়ে বিষ্ণুরাম তাঁর জমিদারি ভাগ করেন দুই পুত্রের মধ্যে—রাধানাথ পান ছয় আনা, প্রাণনাথ পান দশ আনা অংশ। সেই থেকেই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এ দু’টি পরিচিত হয় ছয়আনি জমিদারবাড়ি ও দশআনি জমিদারবাড়ি নামে।

ছয়আনি জমিদারবাড়ির ইতিহাস ছিল রাজকীয়তায় ভরা—হাতির হুংকার, দোল উৎসবের রঙ, অতিথিশালার দীপালোক আর মেলা-পার্বণের প্রাণচঞ্চলতা। আজ সেই বাড়ি ও গেটের বেশিরভাগই বিলুপ্ত, তবুও যে গেটের মধ্য দিয়ে হাতি প্রবেশ করত, প্রজারা করজোড়ে প্রণাম করত জমিদারকে—সেই গেট আজও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের দোরগোড়ায়। মসজিদের পাশে থাকা এই গেটের নিচ দিয়ে এখন কেবল বাতাস যায়, ধুলো উড়ে, আর মানুষ থেমে তাকায় অতীতের মুখে।

প্রাণনাথের দুই পুত্র ছিলেন—বৈদ্যনাথ ও শিবনাথ। বৈদ্যনাথের দুই পুত্র—গিরিজানাথ ও সতীন্দ্রনাথ—বহন করেছিলেন সেই বংশের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার উত্তরাধিকার। প্রাণনাথের পৌত্র গিরিজানাথ রায় ছিলেন মহান শিক্ষানুরাগী; তিনি ১৮২৮ সালে পুরাতন সাতক্ষীরায় প্রতিষ্ঠা করেন এক পাঠশালা, যা আজও টিকে আছে জি. এন. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে—তাঁর নামের আদ্যক্ষরে।

অন্যদিকে, রাধানাথের বংশধর দেবনাথ রায় খনন করেন এক বিশাল দীঘি, নির্মাণ করেন টাউন হল ময়দান, দোলমঞ্চ ও অতিথিশালা ভবন। তাঁর উদ্যোগেই ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাণনাথ মাইনর স্কুল, যা ১৮৬২ সালে মধ্য ইংরেজি হাইস্কুলে, পরবর্তীতে কলেজিয়েট হাইস্কুলে উন্নীত হয়—আজও যা সাতক্ষীরার শিক্ষার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ।

আজ সেই ঐতিহ্যবাহী গেটের উপর জন্মেছে ঘাস, ভেতরে বাসা বেঁধেছে পাখি; জমি বিক্রি হয়ে সেখানে উঠেছে আধুনিক ভবন। মাটিতে বসে যাওয়া ভগ্ন ইটের গায়ে লেগে আছে শতবর্ষের ধুলো, তবু গেটের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়—যেন সময়ের দরজা খুলে গেছে, যেন এই পথ দিয়েই আবার প্রবেশ করছে জমিদারবাড়ির হাতি, চাকর-বাকরের দল দৌড়ে আসছে, আর রাজবাড়ির উঠোনে বাজছে ঢোল-ঢাক।

এই গেট কেবল স্থাপত্য নয়—এটি সাতক্ষীরার ঐতিহ্যের প্রতীক, এটি যেন বলছে— “আমি ইটের গাঁথুনি নই, আমি এই শহরের জন্মের সাক্ষী।”

যারা প্রাচীন শিকড়ের গল্প খোঁজেন, তাদের জন্য এই গেট এক উন্মুক্ত ইতিহাসের পাতা— যেখানে মানুষ কেবল স্থাপত্য দেখে না, দেখে সময়ের মুখ, শোনে প্রজন্মের ফিসফিসানি। আজ হয়তো ছয়আনি জমিদারবাড়ির গেট ভগ্ন, কিন্তু তার ভেতরে এখনো লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার আত্মার কাহিনী।

বিষ্ণুরাম থেকে প্রাণনাথ, প্রাণনাথ থেকে গিরিজানাথ—এই বংশধারাই আধুনিক সাতক্ষীরার ভিত্তি। তাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সমাজসেবার যে আলোকবর্তিকা, তা আজও ছায়া হয়ে আছে এই ইটের ভেতরে।

এই গেটের নিচে দাঁড়ালে মনে হয়— যেন ইতিহাসের দরজায় হাত রেখেছি, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এক শহরের আত্মজাগরণ।

শিল্প ও সংস্কৃতি-এর আরও খবর