শেকড়ের টানে: শৈশবের স্মৃতি ও আগামীর পথচলা

  বিশেষ প্রতিনিধি    21-04-2026    291
শেকড়ের টানে: শৈশবের স্মৃতি ও আগামীর পথচলা

শৈশবের স্মৃতি যেন এক রঙিন ক্যানভাস—অমলিন, উজ্জ্বল, আর গভীর আবেগে ভরপুর। বিশেষ করে অলস দুপুরে, যখন পরিবারের কেউ পুরনো দিনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে, তখন স্মৃতির পাতা যেন নিজে থেকেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমার ছোট ভাইয়ের একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা পড়ে মনে হলো—আমারও কিছু স্মৃতি যোগ করা উচিত। তাই তার লেখার সঙ্গে নিজের কিছু অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা জুড়ে দিলাম।

আমাদের বাড়ির বাগান ছিল মৌসুমি ফলের এক ভান্ডার—জাম, জামরুল, ঢেউয়া, লিচু, কলা, চালতা, বেল, গোলাপজাম, আর ছিল প্রায় ১০–১৫ জাতের আম ও হরেক স্বাদের রসালো কাঁঠাল। তালশাঁস, শুকনো নারকেল থেকে তেল বানানোর প্রস্তুতি, আর তার ভেতরে পাওয়া সাদা বলের মতো কোমল শাঁস—যাকে আমরা বলতাম ‘নারকেলের ফুপা’—এসবের স্বাদ আজও মনে জাগে।

আমাদের পেয়ারা বাগানটিও ছিল বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। বরিশালের নানা জাতের বড় বড় পেয়ারা গাছ ছিল আমাদের গর্বের প্রতীক। পাশাপাশি সেগুন, মেহগনি, লেবু আর জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা কাঠবাদাম গাছ ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। ধারালো দা দিয়ে সাবধানে কাঠবাদাম ভাঙার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।

তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল বুনো ফল ‘জামজুম’। সবুজ থেকে হলুদ, কমলা, লাল হয়ে গাঢ় কালো রঙে পরিণত হওয়া এই ফলের খোঁজে ঝোপে ঝোপে ঘুরে বেড়ানো ছিল এক অনন্য আনন্দ। আর জঙ্গলের গাব গাছের পাকা গাব! মগডালে উঠে সেই গাব পাড়ার নেশায় একবার প্রায় ২০-২২ ফুট ওপর থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলাম; মাসখানেক শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। তবুও সেই নেশা একটুও কমেনি। এইসব দুঃসাহসিক অভিযানে আমার ছোট ভাই ছিল আমার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। আমার সব উল্টোপাল্টা কাজের ‘কভার’ দিত সে। তার উপস্থিত বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ অনুভূতি ছিল সত্যিই বিস্ময়কর।

একবার এক উঁচু তালগাছে বসে গল্প করছি, হঠাৎ দেখি গাছের কোটর থেকে এক বর্ণিল সাপ বেরিয়ে আসছে। ভয়ে নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু সেই সংকটময় মুহূর্তেও মাথা ঠান্ডা রেখে প্রথমেই ছোট ভাইকে নিরাপদে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। নিজের চেয়ে তাকে আগে বাঁচানোর সেই সহজাত তাগিদ আজও আমাকে এক গভীর আত্মতৃপ্তি দেয়।

শৈশবের সেই দিনগুলোর আনন্দ শুধু গাছপালা বা দুঃসাহসিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না—ছিল একসাথে থাকার, ভাগ করে নেওয়ার সহজ সুখ। করোনাকালের এক বিকেলে ছাদে বসে কাঁচা আমের লটকা, খিচুড়ি, সরিষার তেলে শুকনা মরিচ-পেঁয়াজ ভর্তা আর ডিম ভুনা দিয়ে নাস্তা করতে করতে হঠাৎই মনে পড়ে গেল সেইসব দিন। খোলা আকাশের নিচে সবার সঙ্গে সাধারণ খাবার ভাগ করে নেওয়ার সেই আনন্দ যেন ফিরে নিয়ে গেল শৈশবের পিকনিকের স্মৃতিতে। মা যখন গ্রামের বাড়িতে প্রতিবেশীদের নিয়ে পিকনিকের আয়োজন করতেন—বৈঠকখানায় আমের স্তূপ, সুপারি কাটার শব্দ আর হাসি-আনন্দে মুখরিত পরিবেশ—সেই দৃশ্যগুলো আজও হৃদয়ে অমলিন।

সময়ের প্রবাহে সেই জঙ্গল আর নেই—তার জায়গা নিয়েছে পরিকল্পিত বাগান আর নগরায়ণ। তবুও গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা আজও হৃদয়কে টানে।

আমার বাবা-মা ছিলেন অসাধারণ মনের মানুষ। আট ভাই-বোনের পড়াশোনা ও নানা সংকটের মধ্যেও তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন অকাতরে। বাবা ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ডেকা চেইন’-এ মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশনের মতো আধুনিক কাজে যুক্ত ছিলেন, তবুও কখনো বিদেশে পাড়ি জমানোর কথা ভাবেননি। তাঁদের কাছে বিলাসিতার চেয়ে মানবিকতা আর সহমর্মিতাই ছিল বড়।

করোনাকালের নিঃসঙ্গ সময়ে যখন স্মৃতিগুলো আবার ফিরে আসে, তখন গভীরভাবে মনে পড়ে মা-বাবার কথা। প্রায় ২২-২৬ বছর আগে তাঁদের হারিয়েছি। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ক্যানসারে মা চলে যান, তখন আমি অনার্সে পড়ি; তার চার বছর আগেই হারিয়েছি বাবাকে। তাঁদের স্বল্প সময়ের সান্নিধ্যই আজ আমাদের জীবনের মূল শক্তি হয়ে আছে।

আজকের এই পরিবর্তনশীল সময়ে, যখন পৃথিবী নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়, তখন আমাদেরও ফিরে তাকানো প্রয়োজন। অসার প্রতিযোগিতার পরিবর্তে মমত্ববোধ, সংকীর্ণতার বদলে উদারতা, আর অহংকারের স্থলে বিনয়—এই হোক আমাদের নতুন জীবনের দর্শন। আমাদের অর্জন যেন শুধু ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, শ্রেষ্ঠত্ব নয়—মমত্ববোধই পারে পৃথিবীকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করে তুলতে।

স্মৃতিচারণে: নাজমুল হাসান খান

মুক্তমত-এর আরও খবর

আরও পড়ুন